ভূঞাপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে বইপ্রেমী তরুণ-তরুণী ও যুবকরা ১৭ বছর ধরে বইমেলা করে আসছে

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ যমুনার নদীর কোলঘেষা একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। এ গ্রামের বইপ্রেমী তরুণ-তরুণী ও যুবকরা মিলে প্রতিবছর বর্ণিল সাজে বই মেলার আয়োজন করে থাকেন। একদিন বা দুই দিন নয়, টানা তিন দিন চলে বই মেলা।

মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন দেশ বরণ্যে গুণী ব্যক্তি, কবি, লেখক ও বইপ্রেমীরা। সাথে যুক্ত হন গ্রামের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। ফলে, বইমেলায় বাংলা ভাষা চর্চা থেকে শুরু করে দেশ বরণ্যে ব্যক্তিদের বিষয়ে জনতে পারছেন গ্রামের মানুষ বলছি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের অর্জুনা প্রত্যন্ত এ গ্রামের কথা। গ্রামটিতে প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও জাতীয় শহিদ দিবসের মাস এলেই টানা ৩ দিন ব্যাপি অর্জুনা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাজী ইসমাইল খাঁ কারিগরি কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে প্রাণের বইমেলার আয়োজন করেন স্থানীয় অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার। বইমেলার আগের দিন রাতে ১২ টা ১ মিনিটে কলেজের শহীদ মিনারে মহান শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

সূর্য্য ওঠার আগেই গ্রামের শিশু থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি পেশার লোকজন কলেজ প্রাঙ্গণে নির্মিত শহীদ বেদীতে ফুলেল শুভেচ্ছা ও পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও গ্রামের কোমলমতি শিশুসহ বয়োজ্যেষ্ঠদের অংশগ্রহণে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে পতাকা উত্তোলন করে।

বইমেলার উদ্বোধন করেন- হাজী ইসমাইল খাঁ কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ, গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের গ্রতিষ্ঠাতা ও স্বপ্নদেষ্টা আবদুস ছাত্তার খান বাবু।

২১শে ফেব্রুয়ারি বইমেলা উদ্বোধনের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে বইমেলা ঘুরে দেখা যায়, বইমেলায় ছোট-বড় প্রায় ১০টি স্টল রয়েছে। সেখানে নানান লেখকের বইয়ের পচড়া সাজানো হয়েছে। স্টলগুলোতে রঙবে রঙ রুপ নিয়েছে।

মেলায় তরুণ-যুবকদের চেয়ে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি বেশি। তারা স্টলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছেন আর পছন্দের বইগুলো কিনছেন। বিকেল হলে স্টলগুলোতে শিশুদের উপচে পড়া ভিড় জমে যায়। বইমেলার আয়োজক অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগার সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সাল থেকে টানা ১৭ বছর ধরে বইমেলার আয়োজন করা হচ্ছে। বইমেলার শুরুতে মানুষদের সহযোগিতা না পেলেও ধীরে ধীরে তাদের সহযোগিতা বাড়ছে এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় বইমেলা হচ্ছে।

বইমেলায় শুধু বই বিক্রি হয় না। গ্রাম-অঞ্চলের মাটির তৈরি নানা ধরণের পণ্য সামগ্রী, বাঁশ-বেতের পণ্য, জিলাপি দোকান, খেললা দোকান, নাগরদোলা, বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলা হয় এই মেলায়। শুধু তাই নয়, বইমেলা উপলক্ষ্যে ছড়া, কবিতা, রচনা, গল্প ও গানের প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়।

এবারের বইমেলায় ১০টি স্টল অংশ গ্রহণ করেছে। তারমধ্যে টাঙ্গাইল পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক কবি মাহমুদ কামালের সাধারণ গ্রন্থাগার, জয় বাংলা পাঠাগার, ভালবাসার শূন্যতা, হাজী ইসমাইল খাঁ কলেজ, প্রসূতি, বাঁশি, সৌখিন নার্সারী, ভূঞাপুর ব্লাড ব্যাংক, গোল্ডেন মানে চুমুক, র‌্যামণ নিকেতন।

বইমেলায় আসা ৫ম শ্রেণিতে পড়ুয়া সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘প্রতিবছর এখানে বই মেলা হয়। গত বছর আমি ৪ টি বই কিনেছিলাম। এবারো কিনতে আসছি। বইয়ের দোকানগুলো ঘুরে দেখছি। এবার আরও বেশি করে বই কিনব।

৭ম শ্রেণির ছাত্রী রাইসা খাতুন বলেন, ‘শহরে বইমেলা হয়। আমরা গ্রামের মানুষ। তাই শহরের বইমেলায় যেতে পারি না। তবে, শহরের বইমেলার অভাব পূরণ হচ্ছে আমাদের গ্রামের বইমেলা থেকেই। এ বইমেলা থেকে সবধরণের বই পাওয়া যায়।

স্থানীয় শিক্ষার্থী সেতু খন্দকার, জেসমিন চৌধুরী, রিতু খাতুন ও রচিয়তা আক্তার বলেন, ‘গ্রামে এমন বইমেলার আয়োজন হয় বহু বছর ধরে শুনে আসছি। কিন্তু আসতে পারেনি, এবার সহপাঠীরা মিলে প্রাণের বইমেলায় এসেছি। বইমেলার সব’কটি স্টল ঘুরলাম। সত্যি খুব ভাল লাগল। সহপাঠীরা মিলে মেলা থেকে অনেক লেখকের ১০-১২ টি বই কিনেছি। কর্তৃপক্ষকে বলব ৩ দিন নয়, প্রতিবছর যেন সপ্তাহব্যাপি বইমেলার আয়োজন করা হয়’।

জয় বাংলা স্টলের সোহাগ বলেন, এ গ্রামে প্রতিবছর বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। তা শুনে এবার প্রথমবারের মতো আমরা স্টল দিয়েছি। বইমেলায় শিশু-কিশোরদের পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ মুখোরিত। প্রতিদিন শিশু-কিশোরদের ছড়া, কবিতা ও মুক্তিযুদ্ধের বই বেশি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ভাষা শহিদদের নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইও উৎসাহ নিয়ে কিনছেন শিশু-কিশোররা।

অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগাররের সভাপতি অমিদ হাসান (অনন্ত) ও রাকিব খান সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের অর্জুনা গ্রামটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অর্জুনা হাজী ইসমাইল খাঁ কারিগরি কলেজ মাঠে অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারের উদ্যোগে প্রতিবছর অমুর একুশে বইমেলার আয়োজন করা হয়। ৩ দিনব্যাপি এ বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।

বইমেলায় অংশ নেন, গ্রামের লোকজন ও দূ-দূরান্তের মানুষ। আসেন লেখকরাও। খুব সুন্দর পরিবেশে বইমেলা হয়। বই মেলার মাধ্যমে বাংলা ভাষার চর্চা ও দেশপ্রেমসহ ৫২’র ভাষা আন্দোলনে বীর শহিদদের বীরত্বটা জানতে সক্ষম হচ্ছে’।

হাজী ইসমাইল খাঁ কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ ও গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন’র প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছাত্তার খান বাবু বলেন- ‘আমি যখন ঢাকা কলেজে লেখাপড়া করি তখন ঢাকায় বইমেলা দেখে আমার মনে গ্রাম-অঞ্চলে বইমেলার স্বপ্ন জাগে। এরই অংশ হিসেবে ২০০৬ সাল থেকে টানা ১৭ বছর ধরে প্রত্যন্ত গ্রাম-অঞ্চলে বইমেলার আয়োজন করে আসছি। প্রথম দিকে গ্রামের মানুষদের তেমন কোন উৎসাহ না পেলেও বর্তমানে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।

তিনি বলেন- ‘এছাড়াও মেলায় বিভিন্ন সময়ে দেশ বরণ্যে ব্যক্তিদের আগমনে মেলাস্থল উৎসবমুখর হয়েছে। সেসময়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে স্যার সলিমুল্লাহ, সৈয়দ আবুল মকসুদ, নাট্যকার মামুনুর রশিদ, জাবি’র মান্স চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্থাপন বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক সচিব সাবেক সাংসদ খন্দকার আসাদুজ্জামান, কাদেরীয়া বাহিনীর বেসাময়িক প্রধান আনোরুল আলম শহীদ প্রমূখসহ অন্যান্য বিশিষ্টজন ব্যক্তিরা বইমেলায় আসেন’।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap