টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের আসন্ন কাউন্সিল ঘিরে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ মহান মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগার খ্যাত টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামীলীগের আসন্ন কাউন্সিল ঘিরে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। কাউন্সিলের দিন-তারিখ নির্ধারন না হলেও আগামী জুলাই মাসে জেলা আওয়ামীলীগের কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জেলার ১২ টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলার কাউন্সিল শেষে নয়া নেতৃত্ব এসেছে।

আসন্ন কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে সভাপতি পদে বর্তমান সভাপতি জেলা পরিষদের প্রশাসক একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুক ও দলের সহ-সভাপতি বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলমগীর খান মেনুর নাম শোনা যাচ্ছে।

অপরদিকে, সাধারণ সম্পাদক পদে আট জন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে তারা ইতোমধ্যে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন।

জানা গেছে, সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম(ভিপি জোয়াহের) এমপি, দলের যুগ্ম-সম্পাদক খন্দকার আশরাফুজ্জামান স্মৃতি, অপর যুগ্ম-সম্পাদক নাহার আহমদ, দলের সহ-সভাপতি মো. ছানোয়ার হোসেন এমপি, সহ-সভাপতি শামসুল হক, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র জামিলুর রহমান মিরণ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ তারেক মাহমুদ পুলু এবং কোষাধ্যক্ষ বাহারুল ইসলাম মিণ্টর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এদের মধ্যে অনেকেই নিজ অবস্থান ঠিক রেখে কাউন্সিলর ও ডেলিগেটদের মন যোগাতে প্রয়াস পাচ্ছেন।

কেউ কেউ সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সাথে নিয়ে ক্ষমতার মহড়া দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ক্ষমতাসীন স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট রয়েছেন। অনেকে ফজলুর রহমান খান ফারুককে সভাপতি মেনে তারও সমর্থনপুষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন।

অনেকে দলের হাই কমান্ডে যোগাযোগ রক্ষা করে আখের গোছানোর পরিকল্পনা করছেন। তবে কেউ স্থানীয় কাউন্সিলরদের ধার-ধারছেন না। সবাই মোটামোটি ধারণা করছেন- আগামি কমিটি কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের সমর্থনে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা হবে এবং ওই কমিটির প্রতি সকলের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ৬টির কাউন্সিল অধিবেশনের মধ্য দিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরমধ্যে ধনবাড়ী উপজেলায় সভাপতি পদে অধ্যাপক মীর ফারুক আহমাদ ফরিদ ও সাধারণ সম্পাদক পদে সাবেক পৌর মেয়র খন্দকার মঞ্জুরুল ইসলাম তপন।

ভূঞাপুর উপজেলায় সভাপতি পদে বর্তমান পৌর মেয়র মাসুদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক পদে আব্দুল হামিদ ভোলা মৃত্যুবরণ করায় সাবেক আওয়ামী যুবলীগ নেতা ও বর্তমান কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক তাহেরুল ইসলাম তোতা ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সখীপুর উপজেলায় সভাপতি পদে শওকত সিকদার ও সাধারণ সম্পাদক পদে সাবেক এমপি অনুপম শাজাহান জয়।

বাসাইলে সভাপতি পদে মতিউর রহমান গাউছ ও সাধারণ সম্পাদক পদে মির্জা রাজিক। মির্জাপুর উপজেলায় সভাপতি পদে মীর শরিফ মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক পদে ব্যারিস্টার তাহরীম সীমান্ত।

দেলদুয়ার উপজেলায় সভাপতি পদে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুল হক ও সাধারণ সম্পাদক পদে ব্যবসায়ী শিবলী সাদিক। এসব কমিটিগুলোর সবগুলো দলের সিনিয়র নেতারা এসে ঘোষণা দিয়েছেন। কোনটিতে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটের প্রয়োজন হয়নি। কোথাও কোথাও পদ না পেয়ে সমর্থিত নেতাকর্মীদের কান্নার রোল পড়েছে।

মির্জাপুর উপজেলার কমিটি ঘোষণার পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতারা লাঞ্ছিত হয়েছেন। জুন মাসের মধ্যে বাকি ৬টি উপজেলার সম্মেলন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

দলীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, জেলা আওয়ামীলীগের কার্যকরী কমিটিতে সভাপকি পদে একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুক অন্যদের তুলনায় অনেকটাই যোগ্য। তার মেধা, মনন ও প্রজ্ঞা দলের জন্য সহায়ক। অপরদিকে আলমগীর খান মেনু পরীক্ষিত নেতা, সাংস্কৃতিক অঙ্গণে তার পদচারণা ঈর্ষণীয়। দলীয় সকল কর্মকান্ডে তার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

সাধারণ সম্পাদক পদে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম(ভিপি জোয়াহের) এমপি একজন যোগ্য ব্যক্তি। অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতায় দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন। এমপি হিসেবে যতটা সময় না দেন তার চেয়ে ঢেড় সময় ব্যয় করেন সাংগঠনিক কর্মকান্ডে। তার প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে রয়েছেন খন্দকার আশরাফুজ্জামান স্মৃতি। তিনিও সংগঠনিকভাবে দক্ষ, তিনি একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ। সব সময় নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলেন।

তাই অধিকাংশ নেতাকর্মীরা তার কাছে ঘেষতে পারেন না। অপর যুগ্ম-সম্পাদক নাহার আহমদ একমাত্র নারী সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। কিন্তু পারিবারিক কলহের কারণে তিনি বিপর্যস্ত। সাবেক মেয়র জামিলুর রহমান মিরণ আগাগোড়া সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব। মেয়র থাকাকালে কিছু দুষ্ট লোককে কাছে ভিড়ানোর কারণে মনোনয়ন বঞ্চিত হন। সাধারণ সম্পাদক পদ পেতে তিনি দলীয় হাইকমান্ডে যোগাযোগের পাশাপাশি স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি মো. ছানোয়ার হোসেন এমপি প্রথমে কথিত ‘খান পরিবার’ এর ছত্রছায়ায় সংসদ সদস্য হওয়ার প্রয়াস পান। বর্তমান সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুকের সাথে তার বিরোধ চরমে। তিনি সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়ার জন্য এক প্রকার মরিয়া হয়ে ওঠেছেন। কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডে যোগাযোগের সাথে তিনি ‘খান পরিবার’ ঘরাণার ব্যক্তিদের একাত্ম করার চেষ্টা করছেন। খান পরিবারের সহযোগিতায় জেলা আওয়ামীলীগের নেতাদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন।

সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও দলের যুগ্ম-সম্পাদক শাহজাহান আনছারী, দপ্তর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম খান, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা নবীন, সাবেক এমপি মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুলের ছেলে জেলা আ’লীগের ক্রীড়া সম্পাদক মির্জা মইনুল হোসেন লিণ্টু সহ অনেককেই তিনি কাছে টানতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান কমিটির বন ও পরিবেশ সম্পাদক সৈয়দ তারেক মাহমুদ পুলু স্বপদেই অনেকটা সন্তুষ্ট।

তিনি মূলত ক্লীন ইমেজের রাজনীতিক। খান পরিবার বিরোধী ঘরাণার নেতাদের সমর্থনে তিনি সাধারণ সম্পাদক হতে চান। জেলা আওয়ামীলীগের জনপ্রিয় নেতা প্রয়াত ফারুক আহমদ হত্যা-বিরোধী ভূমিকা রেখে নিজ কর্মকান্ডে জনপ্রিয় হয়েছেন।

হাইকমান্ড বিবেচনা করলে তিনি সাধারণ সম্পাদক হতে চান। জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ বাহারুল ইসলাম মিণ্টু মূলত একজন ব্যবসায়ী। তিনি দলের কোষাধ্যক্ষ পদ এক প্রকার কব্জা করে রেখেছেন। তার মূল টার্গেট সদর আসনের সংসদ সদস্য পদ। এতোসব বাঘা বাঘা নেতাদের মধ্যে প্রার্থীতা ঘোষণা করে সাধারণ সম্পাদক হতে পারলে সদর আসনে মনোনয়ন পাওয়া তার জন্য সহজতর হবে।

দলের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শামছুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষিত ছাত্রলীগ নেতা থেকে বর্তমান পর্যন্ত এসেছেন। তিনি কখনো দলের কাছে কিছু চাননি। একজন ত্যাগী নেতা হিসেবে সাধারণ সম্পাদকের পদ তার পাওনা হিসেবে বিবেচনা করেন।

জেলার রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করেন, ক্ষমতাসীন দলের কমিটি হিসেবে বর্তমান কমিটি তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে। জেলা শহরে কোন রাজনৈতিক হানাহানি চোখে পড়েনি। রাজনৈতিক হত্যাকান্ডও ঘটলেও জনসাধারণের মধ্যে তার কোন প্রভাব পড়েনি। জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের কতিপয় কর্মকান্ড বিতর্কের সৃষ্টি করলেও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ তা দলীয়ভাবে মোকাবেলা করেছে। এক কথায়, জেলা প্রশাসনের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করেছে।

জেলার আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মীরা জানায়, বিএনপি-জামায়াত থেকে চোরাগলি দিয়ে আওয়ামীলীগে আসা নেতারাই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে থাকে। তারা যখন ত্যাগী কর্মীদের উপর খবরদারী করে তখন খুব কষ্ট হয়। দলীয় নেতারা আজকাল কেন্দ্রীয় কর্মসূচির বাইরে কোন কর্মসূচি দেন না বা পালন করেন না- এটা দলীয় দেউলিয়াত্বের বহি:প্রকাশ।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম(ভিপি জোয়াহের) এমপি জানান, বিগত সময়ে তিনি দলের জন্য দিন-রাত চিন্তা করেননি- সব সময় কাজ করেছেন, নেতাকর্মীদের সুখে-দু:খে পাশে থেকেছেন। দলীয় সকল কাজে সর্বাগ্রে ভূমিকা রেখেছেন। অসুস্থাবস্থায়ও দলের নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন- এখনও আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap