ঘাটাইলের ঐহিত্যবাহী ‘ধলাপাড়া হাট’ এখন বানিজ্যিক মার্কেটে পরিনত করা হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়া ইউনিয়নের ঐহিত্যবাহী ‘ধলাপাড়া হাট’ এখন বানিজ্যিক মার্কেটে পরিনত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই হাটটির চারপাশে তৈরি করা হচ্ছে দোকান ঘর। আর এসব দোকান এককালিন চার লাখ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে করে ওই হাটে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা প্রায় তিন শতাশিক দরিদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসেছেন।

ধলাপাড়া ভূমি অফিস সূত্র জানায়, ধলাপাড়ার এ হাটটি এক সনের জন্য লিজ দেওয়া হয়। ১৪২৯ সনের পহেলা বৈশাখ এই হাটের ইজারা নেন ওই এলাকার মজিবর রহমানের ছেলে শফিকুল ইসলাম শফি। আর এই হাটের ইজারামূল্য ধরা হয় ২০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। গত বছরও তিনিই পেয়েছিলেন এই হাটের ইজারা। দীর্ঘদিন ধরে এই হাটটি ছোট ছোট ভিটি তৈরি করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু এবারের চিত্রটা পুরোটাই ভিন্ন।

জানা যায়, হাটটি ইজারা নিয়েই আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছাঁয়ায় ইজারাদার শফিকুল ইসলাম হাটের সামনের ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করেন। এরপর তাদের জানানো হয় হাটের সামনের অংশে দোকান নির্মান করে সেগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ দোকান বরাদ্দ নেওয়ার জন্য তাদের কাছে ৪/৫ লাখ টাকা দাবি করেন। তা না হলে অন্য কাউকে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে।

হাটের সামনের অংশে ৪৮টি দোকান-ঘর নির্মান করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেগুলো বরাদ্দও দেয়া হয়েছে ৪/৫ লাখ টাকার বিনিময়ে। আর এসব দোকানের বরাদ্দ পেয়েছেন জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ নেতাসহ প্রভাবশালীরা। আর প্রভাবশালীরা দোকান বরাদ্দ দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। আর এই টাকার ভাগ দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হাটের সামনের অংশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া ছোট ছোট ভিটিগুলো ভেঙ্গে সেখানে নির্মান করা হচ্ছে স্থায়ী দোকান-ঘর। বাদ পরেনি হাটের পাশে থাকা পুকুর ও ধলাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠও। পুকুর ও খেলার মাঠেও নির্মান করা হয়েছে দোকান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাটে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, যুবলীগের আহব্বায়কসহ প্রভাবশালীদের মাঝে হাটে নির্মান করা দোকানগুলো মোটা অংকের টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একারনে প্রায় তিন শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পথে বসেছেন।

দক্ষিন ধলাপাড়া গ্রামের সেন্টু মিয়া জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হাটটিতে ছোট একটি ভিটি নিয়ে বাদাম বিক্রি করে কোনভাবে সংসার চালাতেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গত গত দুই মাস আগে তাকে হাটের ইজারাদার শফিকুল ইসলাম জানায়, হাটের সামনের অংশ তিনি ৯৯ বছরের নামে লিজ নিয়েছেন। তাই এখানে (সামনের অংশে) দোকান নির্মান করা হবে। যদি দোকান নিতে চান তাহলে সাড়ে চার লাখ টাকা দিতে হবে।

একই এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তিনিও এই হাটে ছোট একটি ভিটি নিয়ে বাদাম বিক্রি করতেন। কিন্তু এখন তিনি পুরোটাই নিস্ব হয়ে পরেছেন। তাকে উচ্ছেদ করে সেখানে নির্মান করা হয়েছে দোকান। আর সেই দোকান ৫ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একজন প্রভাবশালীর কাছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, তার ভাই একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। এ কারনে তার ভাইও একটি দোকান ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে বরাদ্দ নিয়েছেন। তিনি শুনেছেন শফিকুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা হাটের সামনের অংশ ৯৯ বছরের নামে লিজ নিয়েছেন।

ধলাপাড়া এসইউপি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামছুল হক জানান, খেলার মাঠের সামনের অংশে যেখানে দোকান নির্মান করা হচ্ছে সেটির বিষয়ে এসিল্যান্ড, ইউএনও, নায়েব ও উপজেলা চেয়ারম্যান তারাই ভালো বলতে পারবেন।

ধলাপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব মো. আওয়াল বলেন, হাটটি এক বছরের জন্য শফিকুল ইসলামকে ইজারা দেয়া হবে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত কথা বলবেন বলেও তিনি জানান।

ঘাটাইল উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মোছাঃ ফারজানা ইয়াসমিন জানান, দোকান বরাদ্দ নেওয়ার জন্য যারা আবেদন করেছিলেন তাদের মাঝেই দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এই দোকান বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে কতটাকা লেনদেন হয়েছে আর বিদ্যালয় মাঠে দোকান নির্মানের বিষয়টি তিনি জানেন না।

ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিয়া চৌধুরী জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। হাটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি আগের ইউএনও জানেন।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গনি জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। তদন্ত সাপেক্ষে ইউএনওকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap