ভূঞাপুরে এশিয়া মহাদেশের ব্যতিক্রমী বঙ্গবন্ধু সেতু আঞ্চলিক জাদুঘর অবস্থিত

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ এশিয়া মহাদেশের এই ব্যতিক্রমী অন্যতম জাদুঘর টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত। জাদুঘরটি উদ্ভিদ, প্রাণী, সেতু নির্মাণের দুর্লভ ছবি ও স্থানীয় লোকজনের ব্যবহৃত নমুনা সংগ্রহের এক ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালা। জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ না করলে বোঝার উপায় নেই জাদুঘরটি কতটা সমৃদ্ধ।

জাদুঘরটি শুধু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করেই সমৃদ্ধ করা হয়নি, এখানে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্য পশুপাখি, পাখির বাসা, পাখির ডিম, সরীসৃপ, বিভিন্ন বিলুপ্ত প্রায় উদ্ভিদের ফুল-ফল-বীজ, মিঠা ও লোনা পানির মাছ, মাছ ধরার ফাঁদ, মানুষের ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র ও বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণকালীনের গুরত্বপূর্ণ তথ্য ও দুর্লভ ছবি।

জাদুঘরের কোন প্রাণী পরিকল্পিতভাবে মারা হয়নি, বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক কারণে ও দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মারা গেছে। জাদুঘরের সুচনালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটি জীববৈচিত্র রক্ষায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে লিফলেট, মাইকিং ও স্থানীয় মিডিয়ার মাধ্যমে জনসচেনতা চালিয়ে আসছে।

এ জাদুঘরে প্রায় ৫ হাজার নমুনা সংরক্ষিত আছে। তার মধ্যে রয়েছে ১৩০ প্রজাতির পাখি, ৩২ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ২৭৫ প্রজাতির মিঠা পানি-সামুদ্রিক মাছ, ১৫০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৬৬ প্রজাতির পাখির বাসা, ৪৪ প্রজাতির পাখির ডিম, ৮০৯ প্রজাতির ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ, ৯০০ উদ্ভিদ নমুনা (শস্য বীজ-ফুল-ফল-ঔষধি-লতা-গুল্ম), ৩৬৫ ঐতিহ্যবাহী সামাজিক-সাংস্কৃতিক নমুনা, সেতু নির্মাণের তথ্য, নকশা, কৌশল ও দুর্লভ ৮০৪টি ছবি। এর মধ্যে আছে ৯ প্রজাতির ইঁদুর-চিকা-কাঁঠবিড়ালী, ৬ প্রজাতির বাদুর-চামচিকা, ৫ প্রজাতির বক, ৩ প্রজাতির হাঁস, ৮ প্রজাতির চিল-বাজ-ঈগল, ২ প্রজাতির আবাবিল পাখি, ৭ প্রজাতির কচ্ছপ, ৮ প্রজাতির টিকটিকি, ৯ প্রজাতির ব্যাঙ, শতাধিক জাতের প্রজাতির-ফড়িং, ৫ শতাধিক অন্যান্য পোকাণ্ডমাকড়।

এছাড়াও এখানে আরও অনেক দুর্লভ প্রাণী সংরক্ষিত আছে। এগুলোর হয়তো অনেকে নামও শুনেনি এবং দেখেনওনি কোন দিন। এগুলোর মধ্যে হচ্ছে- দৈত্য শুকুন, বেঙ্গল শুকুন, নাগ ঈগল, মেছো ঈগল, মরু বাজ, টিকাশাহীন, বেগুনী বক, লাল বক, সবুজ ঘুঘু, হরিতাল, বুনো মাছরাঙা, খেনি/গুরগুরি, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আবাবিল, সোলায়মান (আ:) এর সময়ের হুদহুদ পাখি, গেছো সাপ, ডোরা আঞ্জন, মর্মর ব্যাঙ, নীল গাই, চিতা বিড়াল ইত্যাদি।

সেই সাথে সংরক্ষণযোগ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জীবজ নমুনা সংরক্ষিত হচ্ছে এ জাদুঘরে।

অপরদিকে, টাঙ্গাইল ছাড়াও মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, বগুড়া ও গাইবান্ধাসহ বেশ কয়েকটি জেলার সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহারিক শিক্ষার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে এ জাদুঘরটি।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় দেশের সকল ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জাদুঘরটি পরিদর্শনে আসেন। জাদুঘরটি পরিদর্শন করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতগণ।

এ জাদুঘরটি পরিদর্শনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, গুছানো, দুর্গন্ধমুক্ত ও শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, দর্শনার্থীদেরকে বিশ্বের কোন উন্নত দেশের জাদুঘর দেখার অভিজ্ঞতাকে মনে করিয়ে দিবে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে প্রতিটি নমুনা পাত্রে প্রাণির ইংরেজি, বৈজ্ঞানিক ও বাংলা নাম সংক্ষিপ্ত পরিচিত লিপিবদ্ধ আছে। শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অনন্য শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্যে গবেষণায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানান জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণকালীন সময়ে (১৯৯৫-৯৭ সালে) সেতু কর্তৃপক্ষের পরিবেশ ইউনিটের অধীনে পরিচালিত ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সমীক্ষা’ কর্মসূচীর আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী জাকের হোসেন-এর নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণীতত্ত্ব সমিতি’ (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ঢাবি) কর্তৃক জাদুঘরের কাজটি বাস্তবায়ন হয়। বর্তমানে জাদুঘরটির জন্য নতুন আধুনিক ৩ তলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

এটি দেখতে দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব রেলস্টেশন ও বাসস্টেশনে নামতে হবে। পরে সেখানে থাকা অটোরিকশা বা অটোভ্যানযোগে ৫-১০ টাকা ভাড়ায় জাদুঘরে যাওয়া যাবে অথবা বাস, প্রাইভেটকার বা মোটরসাইকেল নিয়ে সরাসরি জাদুঘরে যাওয়া যাবে। জাদুঘরে প্রবেশ ফি ৫০ টাকা।

বঙ্গবন্ধু সেতু আঞ্চলিক জাদুঘরের কিউরেটর জুয়েল রানা জানান, প্রতিনিয়ত জাদুঘরে বিভিন্ন ধরণের নমুনা সংরক্ষিত হচ্ছে। এভাবে নমুনা সংগ্রহ বৃদ্ধি পেলেও সকলের সহযোগিতা থাকলে জাদুঘরটি বিশ্বের সেরা একটি জাদুঘরে পরিণত হবে বলে আমি আশাবাদী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     এ বিভাগের আরো সংবাদ
Share via
Copy link
Powered by Social Snap