মধুপুরের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র

রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
বিনিময় বাসে শিক্ষার্থীর সঙ্গে অশালীন আচরণ, করটিয়ায় বাস আটক টাংগাইলে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৮জন গ্রেফতার জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সাংবাদিকদের কার্ড পেতে অনলাইনে আবেদন কাল থেকে সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ বন্ধের হুমকি মধুপুরে অতিরিক্ত মূল্যে এলপি গ্যাস বিক্রির দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা মধুপুরে মহিষমারা কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় ‘উৎপাদনমুখী শিক্ষা’ টাংগাইলে ভোটার বেড়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার জন আইপিএলের সব খেলা সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ মধুপুরে সংবাদের জেরে নদীর কিনার থেকে লাশ উত্তোলন মধুপুরে আত্মহত্যার লাশ হওয়ায় বংশাই নদীতে দাফন

মধুপুরে মহিষমারা কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় ‘উৎপাদনমুখী শিক্ষা’

সংবাদ দাতার নাম
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ বার পড়া হয়েছে

কৃষক পরিবারে জন্ম ছানোয়ার হোসেনের। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করতেন। লেখাপড়া শেষে যোগ দেন শিক্ষকতায়। কিন্তু কৃষির মায়া ছাড়তে পারেননি। তাই কয়েক বছর পর শিক্ষকতা ছেড়ে চলে আসেন গ্রামে। শুরু করেন আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ। বিভিন্ন সবজি ও ফসল আবাদ করে সফলতা আসে। এরপর নিজ বাড়ির পাশে প্রতিষ্ঠা করেন একটি কলেজ। এই কলেজে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় ‘উৎপাদনমুখী শিক্ষা’। এতে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি ও ফসল উৎপাদন শিখছেন। ব্যতিক্রমী এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা মহিষমারা গ্রামে। এ গ্রামের আদর্শ কৃষক ছানোয়ার হোসেন ২০১৩ সালে ‘মহিষমারা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ১৩০ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে এখন শিক্ষার্থীসংখ্যা তিন শতাধিক। টাঙ্গাইল শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এবং মধুপুর উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে মহিষমারা গ্রামের অবস্থান। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। মধুপুরের বিখ্যাত আনারস চাষের অন্যতম এলাকা এটি। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র কৃষক। তাই স্কুল পেরুনোর পর অনেক অভিভাবক সন্তানদের কলেজে পড়াতে পারতেন না। তবে মহিষমারা কলেজ এই এলাকায় শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেছে বলে জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।

ক্লাসের ফাঁকে হাতে–কলমে কৃষিশিক্ষা

কলেজের শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষেরা জানান, ২০১৮ সালে কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। এ জন্য কলেজের পূর্ব দিকে ৪০ শতাংশ জায়গায় একটি কর্নার গড়ে তোলা হয়। যেখানে শিক্ষার্থীদের ছানোয়ার হোসেন পড়াশোনার ফাঁকে হাতে–কলমে বিষমুক্ত নিরাপদ ফসল উৎপাদন শেখান। সেখানে বিভিন্ন মৌসুমের সবজি, ফল, মসলার চারা তৈরিও শেখানো হয়। এখানে চাষবাস শিখে শিক্ষার্থীরা তাঁদের বাড়িতেও সবজিবাগান করতে পারেন। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মহিষমারা গ্রামের শুরুতেই কলেজটির অবস্থান। কলেজে প্রবেশ করে দুপুরের দিকে দেখা যায়, দুটি শ্রেণিতে ক্লাস চলছে। আর উৎপাদনমুখী শিক্ষা কর্নারে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী কাজ করছেন। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছানোয়ার হোসেন তাঁদের সবজিবীজ বোনার আগে মাটি তৈরি শেখাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা তাঁর নির্দেশনামতো মাটি তৈরির কাজ করছেন। ছানোয়ার হোসেন জানান, ১৯৯২ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর তিনি সিলেটের একটি স্কুলে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে চাকরিজীবন শুরু করেন। সেখানে প্রায় সাড়ে তিন বছর চাকরি করে ফিরে আসেন গ্রামে। গ্রামের স্কুলে দুই বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কৃষির আকর্ষণে তিনি সেই চাকরিও ছেড়ে দেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আনারস, কলা, হলুদ, ভুট্টা, মাল্টা, ড্রাগন, পেয়ারা, কফিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করে সফল হন। কিন্তু দেখতে পান, এলাকার ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো কলেজ নেই। দরিদ্র কৃষক পরিবার তাদের সন্তানদের দূরে ছাত্রাবাসে রেখে পড়াতে পারে না। তাই সিদ্ধান্ত নেন, নিজ এলাকায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত বাড়ির পাশের জমির ওপর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মহিষমারা কলেজ। কলেজটি ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে এই কলেজে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য ১৮ জন শিক্ষক রয়েছেন। সরকারের শিক্ষা বিভাগ থেকে একটি পাকা ভবনও এই কলেজে করে দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে ছানোয়ার হোসেন জাতীয় কৃষি পুরস্কার ১৪২৬ পান। বর্তমানে তিনি কলেজটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য। তিনি মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে গ্রামে বসে চাষবাস করেও ভালোভাবে চলা সম্ভব। তাই শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শেষে চাকরি না পেলে যাতে বেকার বসে না থাকেন, সে জন্য তাঁদের উৎপাদনমুখী শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা নেন তিনি। ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশের মাটি উর্বর। এখানে যেকোনো ফসল ফলানো যায়। জমি ছাড়াও রাস্তাঘাট, বাড়ির ছাদ—যেখানে খুশি চাষাবাদ করা যায়। কিন্তু কৃষিনির্ভর দেশ হলেও কৃষি বিষয়টি অবহেলিত। লেখাপড়ার পর কেউ আর মাঠপর্যায়ে কৃষিকাজ করতে চান না। তাই শিক্ষিত যুবকদের কৃষিমুখী করতেই এই উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছি।’

বাড়িতে ফসল ফলাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

কলেজে ক্লাসের বিরতিতে এবং ছুটির পর বিভিন্ন দল করে শিক্ষার্থীদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করা হয় বলে জানান কলেজের প্রভাষক শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ক্লাসের বিরতির সময়ও কেউ কেউ কাজ করেন। অনেক সময় বন্ধের দিন ফসল তোলা বা রোপণের কাজ করা হয়। শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে এ কাজে অংশ নেন। এখানে চাষবাস শিখে অনেক শিক্ষার্থী নিজ বাড়ির আঙিনায় আবাদ করছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটাতে অবদান রাখতে পারছেন। কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী কাজী সিয়াম বলেন, কলেজে এই উৎপাদনমুখী শিক্ষার মাধ্যমে যা শিখেছেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর বাড়িতে বেগুন, লাউ, সিম চাষ করেছেন। এতে তাঁর বাবা–মা খুব খুশি। শিক্ষার্থী প্রিয়া রেমা বলেন, ‘কলেজের এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে কীটনাশকমুক্ত সবজি আবাদ শিখেছি। এতে খুব উপকার হয়েছে।’ আরেক শিক্ষার্থী কামরুল ইসলামও বাড়িতে নিরাপদ বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছেন। তিনি বলেন, এটা সম্ভব হয়েছে কলেজ থেকে এই উৎপাদনমুখী শিক্ষা গ্রহণের কারণে। কলেজের এই উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, এটি খুব ভালো উদ্যোগ। তাঁদের দেখে উদ্ধুদ্ধ হয়ে দেলদুয়ারের আটিয়া মহিলা কলেজেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষিনির্ভর দেশে সবাই যদি কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন, তবে নিরাপদ ফল–সবজি নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবেন।

পড়ালেখাতেও ভালো শিক্ষার্থীরা

কলেজে উৎপাদিত সবজি দিয়ে মাসে একবার শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবারের আয়োজন করা হয় বলে জানালেন কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই মিলেমিশে উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাঁরা বাড়িতে সবজিবাগান করে সফল হন, তাঁদের পুরস্কৃত করা হয়। সেই পুরস্কৃরও দেওয়া হয় কৃষিপণ্য। যেমন শীতকালে কেউ ভালো সবজি আবাদ করলে তাঁকে গ্রষ্মকালীন সবজির বীজ দেওয়া হবে।’ উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যক্ষ বলেন, ‘অন্যান্য কলেজের তুলনায় আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই কলেজের ফল অনেক ভালো। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগ থেকে ৯৯ জন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, এর মধ্যে ৯৮ জন পাস করেছে। জিপিএ–৫ পেয়েছে চারজন।’ সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) মধুপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মো. বজলুর রশীদ খান বলেন, এ উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে কৃষিকাজে উৎসাহিত করবে। কৃষির প্রতি, কৃষকের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা বাড়বে।

সংবাদ টি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

The Trend (Online Shop)

©২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয়)
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102