মধুপুর বনাঞ্চলের গারো জনপদে বানরের উপদ্রব দিন দিন বাড়ছে। এদের উপদ্রবে কৃষকরা অনেকটাই নিরুপায়। ফল, ফসল ও সবজি টালে হামলা ছাড়াও ঘরবাড়িতে চড়াও হয়ে রান্না করা খাবারে ভাগ বসাচ্ছে বানর। বাধা দিলে কামড়িয়ে আহত করছে। সপ্তাহ খানেক ধরে বনের বাইদ এলাকার পাকা রোপা আমন খেয়ে সাবাড় করছে বানররা।
বানর-হনুমান শাল বনের আদি প্রাণী। গজারি ছাড়াও সিধা, গাদিলা, বান্দরলাঠি, আজুলি, কাইকা, সোনালু, বহেড়া, হরীতকী, আমলকী, জিগা, ভুতুম, সিন্ধুরী, বন খেজুর, খুদে জাম, বাজনা, আনাই গোটা ও বন বরই গাছে এরা ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু প্রাকৃতিক বন কমে যাওয়ায় এবং বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে বিদেশি গাছের বনায়ন হওয়ায় বানর হনুমানের খাবার সংগ্রহ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে।
বন বিভাগের তথ্যে মধুপুরে প্রায় ৫ হাজার একরে শালবন টিকে রয়েছে। বানরের খাদ্যখাবার সংগ্রহের সহযোগী গাছপালা বনে খুব একটা নেই। জাতীয় সদর উদ্যান, মধুপুর ও দোখলা রেঞ্জে বানরের একাধিক দল দেখা যায়। প্রতি দলে ৫০/৬০ জন সদস্য থাকে। লহুরিয়া বিট, দোখলা, টেলকি এবং সন্তোষপুর (ময়মনসিংহ বন বিভাগের রসুলপুর রেঞ্জ) বিটের পর্যটন এলাকায় এরা সারা দিন বিচরণ করে। পর্যটকের কলা, বিস্কুট, কেক, মুড়িসহ নানা খাবারে এরা উদরপূর্তি করে। বনে খাবার না পেলে লোকালয়ে চলে আসে। আধা পাকা কলা ও আনারসে মুখ লাগিয়ে নষ্ট করে।
সাধুপাড়ার কলাচাষি আনোয়ার হোসেন জানান, বানর থোড় গুচ্ছে মুখ লাগিয়ে মিষ্টি রস চুষে খেলে সেই থোড়ে কলা ধরে না। পেঁপে ও ড্রাগন বাগানেও এরা চড়াও হয়। বানরের উপদ্রবে তুলাচাষিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তুলার বোলের মিষ্টি রস এরা চুষে খায়। পীরগাছার গারো কৃষক শ্যামল সাংমা জানান, বানর সবজিবাগান তছনছ করে। সবজির কোমল ও কচি পাতা খায়। একবার এলে এরা বারবার আসে।
এবার রোপা আমন খেতে বানরের উপদ্রব চলছে। চুনিয়া গ্রামের মাইকেল রিছিল জানান, বনবাদাড়ে বানর খাবার পায় না। পেটের তাড়নায় গৃহস্থের রোপা আমন ধান খাচ্ছে। দল বেঁধে হাজির হয়। বাধা দিলে খেপে যায়। আক্রমণ করে বসে। ভেদুরিয়া, চুনিয়া ও লহুরিয়া মৌজার মেঘিচোরা, জয়ফলকুড়ি, দীঘল বাইদ, জাং বাইদ, আমতলী বাইদ, ধরা বাইদ, মাথালিয়াকুড়ি, গড়গড়াবাইদ, সাতারিয়া বাইদ, মাথাল কুড়ি ও নওজোরি বাইদের ধান বানর খাচ্ছে।
ভুটিয়া গ্রামের লেলুস মং জানান, চুনিয়া কটেজের অদূরে দুই বিঘা জমি রোপা আমন পাকা শুরুর পর থেকেই বানরকূল খেতে নেমে আসছে। ওরা কিছু খায় আর বাকি ধান মাড়িয়ে নষ্ট করে। বানরের উপদ্রব এবার খুবই বেশি।
মধুপুর বনাঞ্চলের বণ্যপ্রাণী গবেষণা করেছেন কলেজ শিক্ষক ড. এ আর রহমান খান। তিনি জানান, বানরের খাদ্যাভ্যাস প্রজাতি ও বাসস্থানের ওপর নির্ভর করে। এরা কাঁচা পাকা ফল, পাতা, বীজ, বাদাম, ফুল, শাকসবজি এবং গাছের ছাল বাঁকড় খায়। খাদ্যাভাবে ঘাস, ধান, পোকামাকড়, ঘাসফড়িং ও পিঁপড়াও খায়। বন বিভাগ বানর হনুমানসহ বিভিন্ন বণ্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল এবং খাদ্য-খাবার জোগাড়ের জন্য দুই দশক আগে যেসব দেশি প্রজাতির গাছের বনায়ন করেছিল, সেসবের কোনো অস্তিত্বই নেই। সেসব বনভূমি জবরদখল করে প্রভাবশালীরা এখন কলাবাগান করেছেন। শীত এলে বানর, হনুমান বনে তেমন খাদ্য-খাবার পায় না। তখন এরা লোকালয়ে চলে আসে। প্রয়োজনে মানুষের বাড়ি ঘরে চড়াও হয়।
মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা রেঞ্জের ফরেস্টার সাব্বির হোসেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, বণ্যপ্রাণী যাতে প্রকৃতি থেকে স্বাভাবিক ভাবে খাবার সংগ্রহ করতে পারে, সেজন্য শালবন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় শাল সহযোগী বিভিন্ন দেশি প্রজাতির বৃক্ষের বনায়ন চলছে। বণ্যপ্রাণীর দরুন কৃষকরা খুব বেশি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারিভাবে তাদের সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে।