মধুপুরের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র

বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ০৪:২২ অপরাহ্ন

শিরোনাম :

মধুপুরের শালবনের ছায়ায় ঘেরা কালিয়াকুড়ি গ্রাম আজ এক অনন্য মানবতীর্থ

সংবাদ দাতার নাম
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

টাঙ্গাইলের মধুপুরের শালবনের ছায়ায় ঘেরা কালিয়াকুড়ি গ্রাম আজ এক অনন্য মানবতীর্থ। আধুনিক ইমারতের কৃত্রিমতা নেই এখানে; আছে মাটির ঘরের স্নিগ্ধতা আর মানবসেবার এক কিংবদন্তি গল্প। সেই গল্পের কেন্দ্রে আছেন নিউজিল্যান্ডের মানবদরদি চিকিৎসক এড্রিক বেকার, যাঁকে স্থানীয় মানুষ স্নেহভরে ডাকতেন ‘ডাক্তার ভাই’।

‎১৯৬০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চিকিৎসক হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন এড্রিক বেকার। তখন বিশ্বজুড়ে উত্তাল সময়, বিশেষ করে ‘ভিয়েতনাম যুদ্ধ’ ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। ১৯৬৮ সালে তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিউজিল্যান্ড সার্জিক্যাল টিমের সঙ্গে দক্ষিণ ভিয়েতনামে কাজ করতে যান। সেখানে প্রাদেশিক হাসপাতালে যুদ্ধাহত বেসামরিক মানুষের চিকিৎসা করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন—গরিব মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা কতটা দুর্লভ।

‎ভিয়েতনামের পার্বত্য অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে তাঁকে চার মাস আটক রাখা হয়। পরে কমিউনিস্ট সরকারের সিদ্ধান্তে তাঁকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজের জীবন উৎসর্গ করবেন দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবায়। এরপর তিনি ট্রপিক্যাল মেডিসিন, ট্রপিক্যাল চাইল্ড হেলথ ও অবস্টেট্রিকস বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন এবং পাপুয়া নিউ গিনি ও জাম্বিয়ার হাসপাতালে কাজ করে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে চিকিৎসার অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

‎১৯৮০–এর দশকে উন্নয়নশীল দেশে কাজ করার ইচ্ছা থেকেই এড্রিক বেকার জানতে পারেন যে ‘চার্চ অব বাংলাদেশে’র অধীন গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবার বড় প্রয়োজন রয়েছে। মানবিক সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭৯ সালে তিনি উন্নত দেশ নিউজিল্যান্ডের আরাম-আয়েশ ছেড়ে চলে আসেন বাংলাদেশে।

‎টাঙ্গাইলের মধুপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম কালিয়াকুড়িতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কালিয়াকুড়ি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট। এখানেই শুরু হয় তাঁর ব্যতিক্রমী স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘বেয়ারফুট মেডিক’ বা গ্রাম্য স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে গড়ে তোলেন, যাতে তারাই নিজেদের সম্প্রদায়ের চিকিৎসাসেবা দিতে পারে। ডায়াবেটিস ও যক্ষ্মা কর্মসূচি পরিচালনা করতেন রোগীরাই। পাশাপাশি গর্ভকালীন সেবা, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী গ্রামভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তাঁর মূল দর্শন ছিল—গরিবদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, গরিবদের দ্বারাই পরিচালিত।

‎দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই সেবামূলক কাজ চালিয়ে যান এড্রিক বেকার। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর কিছুদিন আগ পর্যন্ত তিনি এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও মেডিকেল সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় এক বছর অসুস্থ থাকার পর ফুসফুসের রোগে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু শেষ সময় পর্যন্ত তিনি তাঁর স্বপ্নের প্রকল্পের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালে গড়ে ওঠা এই ‘মাটির হাসপাতাল’ আজ কেবল একটি চিকিৎসালয় নয়; এটি মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক জীবন্ত স্মারক।

‎ডা. বেকারের মৃত্যুর পর যখন এই সেবার ধারাবাহিকতা থেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখনই শুরু হয় আরেক অনন্য অধ্যায়। দূর দেশ আমেরিকা থেকে ছুটে আসেন চিকিৎসক দম্পতি ডা. জেসন মর্গ্যানসন ও মেরিন্ডি জশকি। বিদেশের স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে তাঁরা চার সন্তানসহ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন কালিয়াকুড়িতে। স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁরাও এখন ‘ডাক্তার ভাই’ ও ‘ডাক্তার দিদি’।

‎এই দম্পতি শুধু চিকিৎসাসেবাই দিচ্ছেন না; মিশে গেছেন এ দেশের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে। তাঁরা এখনো ডা. বেকারের সেই পুরোনো মাটির ঘরেই থাকেন, সাবলীল বাংলায় কথা বলেন এবং তাঁদের সন্তানদের বড় করছেন স্থানীয় শিশুদের সঙ্গে একই পরিবেশে। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে আধুনিক চিকিৎসা ও মমতার সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। যক্ষ্মা, ডায়াবেটিস কিংবা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় কালিয়াকুড়ি হাসপাতাল আজও অটল রয়েছে সেই পুরোনো আদর্শে।

‎মধুপুরের শালবনের নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এই মাটির হাসপাতাল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সেবার কোনো দেশ নেই, মানবতাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

লেখক-শিক্ষার্থী, ‎ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
সুত্র -প্রথম আলো

সংবাদ টি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

The Trend (Online Shop)

©২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত (এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয়)
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102