টাইফয়েডে দৃষ্টিহারানো গফুরের ঘুরে দাড়ানোর গল্প

ঘাটাইলে টাইফয়েডে দৃষ্টিহারানো গফুরের ঘুরে দাড়ানোর গল্প

জন্মের পর ৯ বছর বয়স পর্যন্ত ছিলেন স্বাভাবিক আব্দুল গফুর। এরপর হঠাৎ একদিন টাইফয়েডে আক্রান্ত হন। ওই জ্বরই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জীবনে। দুই চোখেই দৃষ্টিশক্তি হারান। তারপরও থেমে থাকেনি গফুরের জীবন।

বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ ছাড়াও বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতে থাকেন তিনি। একদিন নিজেই লেয়ার মুরগির খামার দেন। এরপরই বদলে যায় তার ভাগ্যের চাকা। মুরগির খামার করে হয়েছেন স্বাবলম্বী। বর্তমানে তার খামারে ২৪০০ লেয়ার মুরগি রয়েছে। এ পর্যন্ত খামার থেকে ২০ লাখ টাকার ডিম ও মুরগি বিক্রি করেছেন।

এখানেই শেষ নয়, লেবু ও বড়ই বিক্রি করেও লাভবান হচ্ছেন এই যুবক। পরিবারের বোঝা হতে না চাওয়া আব্দুল গফুরের উপার্জনে চলে সংসার। অন্ধত্বকে হারিয়ে দেওয়া তিনই এখন পরিবারের বড় সম্পদ। গফুর টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শিশিরচালা গ্রামের আবেদ আলীর ছেলে।

ঋণ করে মুরগিতে লাখোপতি গফুর

ঋণ ও ধার করে ২০১৬ সালে ১২০০ লেয়ার মুরগির বাচ্চা কেনেন আব্দুল গফুর। তবে শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। প্রথম পর্যায়ে খামারে লোকসান হতে থাকে। তবে ২০২০ সাল থেকে ধীরে ধীরে লাভবান হতে থাকেন আব্দুল গফুর। চলতি বছরে ১৭০০ লেয়ার মুরগি বিক্রি করেছেন। মুরগি বিক্রি করে ৯ লাখ টাকা এবং ডিম বিক্রি করে আয় করেছেন ১৫ লাখ টাকা। সেখানে খরচ হয়েছে ১৬-১৭ লাখ টাকার মতো।

নিজ হাতে করেন সব কাজ

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও মুরগির খামারে প্রচুর সময় দেন গফুর। মুরগিকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে ডিম তোলা সবই করেন নিজে হাতেই। পাশাপাশি নিখুঁতভাবে করেন কৃষিকাজও।

আরো পড়ুনঃ ঘাটাইলে এক মাদরাসা শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে শিক্ষক আটক

মুরগির খামার পরিচালনার পাশাপাশি গরু লালন-পালন পারছেন এই যুবক। তার গোয়ালে রয়েছে চারটি গরু। তার আরেক পেশা লেবু ও বরই চাষ। বছরে দেড় লাখ টাকার লেবু ও ৬০ হাজার টাকার বরই বিক্রি করেন তিনি।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে জীবন সংগ্রামে এগিয়ে চলায় পেয়েছেন টাঙ্গাইলের এই যুবক পেয়েছেন সম্মাননা। ২০২৫ সালে ঢাকায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড চ্যানেল আই অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড সম্মাননা পান তিনি।

আলাপকালে জানা যায়, গফুর ও তার বাবা মিলে সংসারে কাজ করে বড় ভাই মাসুদকে মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট এবং ছোট ভাই আরিফকে বিদেশ পাঠিয়েছেন। আর বোনকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনার পর বিয়ে দিয়েছেন। পাশের গ্রামের সুমাইয়া নামের একটি মেয়েকে বিয়ে করেছেন গফুর।

আব্দুল গফুরের মা মাজেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলের খামার নিয়ে প্রথমে দুশ্চিতায় ছিলাম। এখন এই খামার থেকে ভালোই আয় হয়। আমি নিজেও খামারে বিভিন্নভাবে কাজ করে সহযোগিতা করি।’

বাবা আবেদ আলী বলেন, ‘আমি এখনো কৃষিকাজ করি। পাশাপাশি ছেলের খামারেও সময়ই দেই। আমার ছেলের সফলতায় আমি গর্বিত।’

আলাপকালে আব্দুল গফুর বলেন, ‘মানুষের কাছে চাওয়ার থেকে নিজে কিছু কাজ করে উপার্জন করতে চিন্তাভাবনা করি। প্রথমে লোন, ধারদেনা করে লেয়ার মুরগির খামার করি। প্রথম অবস্থায় প্রায় তিন বছর লাভ হয়নি। তবে একপর্যায়ে সফলতার দেখা পাই। ১২০০ মুরগি দিয়ে শুরু করে খামার এখন ২৪০০ মুরগি রয়েছে। আমার এ কাজে পরিবারের সবাই সহযোগিতা করেছে, করছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি কখনো কল্পনা করতে পারেনি যে মুরগির খামার করে লাভবান হবো। ২৪০০ লেয়ার মুরগিতে এখন পর্যন্ত ১৬-১৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সামনে আরও খরচ হবে। আশা করছি সবমিলিয়ে ৩০-৩২ লাখ টাকার ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে পারবো।’

এ বিষয়ে ঘাটাইল উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বাহাউদ্দিন সারোয়ার রিজভী বলেন, ‘অন্ধত্ব আব্দুল গফুরের জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনি নিজেই মুরগিকে খাওয়ানো, ডিম তোলা, ঘর পরিষ্কার করাসহ সব কাজই করেন। তিনি কৃষিকাজও করে থাকেন। অন্ধ হওয়ার পরেও আব্দুল গফুর সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উনাকে আমরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি।’