ঈদ, পূজা-পার্বণ, পহেলা বৈশাখসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দ শাড়ি। আর টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির প্রতি রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। তাই বাঙালি নারীদের কাছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িতে এসেছে বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব। বাহারি ডিজাইনের শাড়ি বুনন এবং তা সারাদেশে সরবরাহ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁতশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও তাঁতীরা।
“নদী, চর, খালবিল, গজারির বন—টাঙ্গাইলের শাড়ি তার গর্বের ধন”—এই প্রবাদে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যের সঙ্গে শাড়ির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যুগ যুগ ধরে সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তৈরির কারিগর ও ব্যবসায়ীরা।
টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে তাঁতের শাড়ি তৈরি হয়। তবে তাঁতপল্লী হিসেবে পরিচিত দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডি, মঙ্গলহোড়, নলশোঁধা, নলুয়া, বড়টিয়া, চিনাখোলা, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাজিতপুর ও করটিয়া এবং কালিহাতী উপজেলার বল্লা-রামপুরসহ প্রায় সব এলাকাতেই ব্যাপকভাবে কাপড় বুননের কাজ হয়ে থাকে।
এইসব তাঁতের শাড়ি ও তাঁতজাত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য পৌর এলাকার বাজিতপুর হাট ও করটিয়ার হাট বিখ্যাত। এছাড়াও তাঁতপল্লীগুলোতে এবং শহরে রয়েছে তাঁতের শাড়ির বিভিন্ন শো-রুম।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা থেকে প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত করটিয়ার হাট। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই হাটটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হাট হিসেবে পরিচিত। করটিয়ার হাট মূলত সপ্তাহে বৃহস্পতিবার বসত। তবে পাইকারদের অনুরোধে গত কয়েক বছর ধরে মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার—তিন দিনই হাট বসছে। মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তাঁতের শাড়ি বেচাকেনা চলে।
অন্যদিকে শুক্রবার ভোররাত থেকে টাঙ্গাইল পৌর এলাকার বাজিতপুরে বসে তাঁতের শাড়ির হাট। এই হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে তাঁতজাত পণ্য ক্রয় করেন। এসব হাটে পাইকার ও খুচরা ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। পাইকার ও খুচরা ক্রেতারা নানা ডিজাইনের কাপড় সরাসরি তাঁতীদের কাছ থেকে ক্রয় করে থাকেন।
তবে টাঙ্গাইলের বাজিতপুরের শাড়ির হাট দেশের সবচেয়ে পুরোনো হাটগুলোর একটি। এখান থেকে সারা দেশের পাইকারি ক্রেতারা নিজেদের পছন্দমতো টাঙ্গাইলের শাড়ি ক্রয় করেন। শুধু দেশের ক্রেতাই নয়, ভারতের ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য দেশের ক্রেতারাও বাজিতপুর ও করটিয়ার হাটে এসে তাঁতের শাড়ি কেনেন।
টাঙ্গাইল করটিয়ার শাড়ি ব্যবসায়ী মো. বুলবুল আনছারী জানান, তাঁতের শাড়ির জন্য দেশজুড়ে বাজিতপুর ও করটিয়ার হাটের সুনাম রয়েছে। এসব হাটে অনেক ধরনের ডিজাইনের কাপড় সরাসরি তাঁতীদের কাছ থেকে তুলনামূলক সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। এখান থেকে পাইকাররা কাপড় কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় খুচরা বিক্রি করেন।
চাঁদপুর থেকে আসা পাইকার আল আমিন জানান, বাংলার নারীদের কাছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির বিশেষ কদর রয়েছে। তাই তিনি নিয়মিত বাজিতপুর ও করটিয়ার হাট থেকে শাড়ি কিনে নিজ এলাকায় বিক্রি করেন।
তাঁতের শাড়ির পাইকারি বিক্রেতা অজিত বসাক জানান, প্রতি সপ্তাহে তিনি এই হাট থেকে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার পিস টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ক্রয় করেন। পরে সেগুলো নিজ জেলায় নিয়ে খুচরা বিক্রি করেন। তিনি বলেন, এ বছর সুতার দাম কিছুটা বেশি হওয়ায় কাপড়ের দামও বেড়েছে। তবে দাম বেশি হলেও টাঙ্গাইলের শাড়ির চাহিদা কমেনি।
তিনি আরও জানান, ঈদকে সামনে রেখে ভারতের ব্যবসায়ীরাও এসে ৮ থেকে ১০ হাজার পিস করে মোট প্রায় দুই লাখ শাড়ি ক্রয় করে নিয়ে যান। ভারতেও টাঙ্গাইলের শাড়ির আলাদা কদর রয়েছে, যা দিন দিন বাড়ছে। চাহিদা বেশি থাকায় এবং তুলনামূলক সুলভ মূল্যে শাড়ি পাওয়ায় তারা টাঙ্গাইলে এসে শাড়ি ক্রয় করেন।
রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি থেকে টাঙ্গাইলের পাথরাইল শিল্প এলাকায় খুচরা কাপড় কিনতে আসা শামিমা আক্তার জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ির সুনাম দেশজুড়ে। তিনিও এই শাড়ি পছন্দ করেন। তাই সরাসরি তাঁতীদের কাছ থেকে শাড়ি কেনার জন্য পাথরাইলে এসেছেন।
টাঙ্গাইল শাড়ি ও বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক জানান, সাধারণত রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে শাড়ির বিক্রি বেশি হয়। তবে এ বছর শাড়ির চাহিদা কিছুটা কম। তবুও শেষ মুহূর্তে বাজারে বাহারি ডিজাইনের শাড়ি বাজারজাত করা হচ্ছে। ঈদের আগের ১০ দিনে বেচাকেনা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে করটিয়ার হাট, বাজিতপুরের হাট ও পাথরাইলের শো-রুমগুলোতে পাইকারি বেচাকেনা ভালোই চলছে।