মধুপুরে আগাছা বিক্রি করে চলছে অনেকের সংসার

মধুপুরে আগাছা বিক্রি করে চলছে অনেকের সংসার

আগাছা! যার নাম শুনলেই মনে হয় এটা কোনো কাজে আসে না। যা আবর্জনা বা ময়লার ভাগাড়ে স্থান করে নেয়ার কথা। কিন্তু না—এ সব আগাছা বিক্রি করেই এখন চলছে মধুপুরের পাহাড়িয়া অঞ্চলের নানান জনের সংসার।

মধুপুরের পাহাড়ী অঞ্চল ‎আনারসের রাজধানী হিসেবে সারাদেশেই পরিচিত। লাল মাটির এ পাহাড়ে রয়েছে আনারস, কলা, পেঁপে, আদা, কচু, হলুদসহ বাহারি সব ফল ফসলের আবাদ। এ সব ফল ও ফসলের সাথে আপনা আপনি জন্মে থাকে নানা জাতের আগাছা ও ঘাস। নানা রকম ফল ফলাদি যেমন বিক্রি হয় তেমনি ওইসব ঘাস ও আগাছাও বিক্রি হয় ভালো দামে। কেননা ওই সব ফল ফলাদিকে নষ্ট পিষ্টের হাত হতে স্বচ্ছ ও পরিপুষ্ট হিসেবে গন্তব্যে নিতে ওই আগাছা বা ঘাস দিয়ে মুড়িয়ে সযত্নে গাড়িতে রাখা হয়।

আরো পড়ুনঃ মধুপুুরে চুরির অপরাধে এতিম শিশুকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন

এ সব আগাছা বা ঘাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জগৎবেড় ও জার্মানলতা নামের ঘাস বা আগাছা। শটি গাছের পাতা, বড় বড় আগাছার চাহিদাও বেশি। এ অঞ্চলে এসব আগাছা প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায় বলে আগাছা বিক্রির পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে অনেকেই। এ সব সংগ্রহ করতে কোনো খরচ বা বেগ পেতে হয় না বিধায় গারোবাজার এলাকার অনেকেই আগাছা বিক্রিকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছে। আর এ সব বিক্রি করেই চলছে তাদের সংসার। কেউ নিজের ছেলে সন্তানকে সাথে নিয়েও সংগ্রহ করছেন আগাছা। কৃষকের জন্য অপকারী হলেও ওদের কাছে ধরা দিয়েছে জীবিকার পথ হিসেবে।

‎সরজমিনে গারোবাজার, মোটেরবাজার গিয়ে শোনা যায়, আগাছা ক্রয় বিক্রয়ের নানা কথা। আনারসের জন্য বিখ্যাত গারোবাজার। এক সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাকে করে আনারস পাঠানোর সময় নষ্টের হাত থেকে রক্ষার জন্য খড় দেয়া হতো। এখন খড়ের দাম বেশি হওয়া এবং খড়ে আনারস তেমন সতেজ না থাকায় এই আগাছার চাহিদা বেড়েছে। তাই শটি পাতা ও আগাছা ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা। ধীরে ধীরে আরো বাড়ছে আগাছার চাহিদা। এখন আর খড় দিয়ে আনারস সাজাতে তেমন একটা দেখা যায় না।

বাজার কেন্দ্রিক ভ্যানওয়ালা কিছু উদ্যমী পরিশ্রমী লোক সকাল থেকে সারা দিন নানা ঝোঁপ-ঝাড়,বন ও আনারস-কলা বাগানের আশপাশ থেকে এসব আগাছা কেটে এনে বিক্রি করে থাকে। ব্যবসায়ীরা খড়ের পরিবর্তে এসব ঘাসজাতীয় আগাছা কিনে আনারস মোড়ানোর কাজ করে ট্রাকে তুলে থাকে। কেউ অর্ডার না দিলেও এসব আগাছা বিক্রেতারা বাজারে নিয়ে আসে। যার যার প্রয়োজন মতো কিনে নেন।

একজন আগাছা বিক্রেতা দিনে দুই তিন ভ্যান আগাছা তুলে এনে বিক্রি করতে পারে। প্রতি ভ্যান আগাছা তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকা কোনো কোনো সময় তার বেশিও বিক্রি হয়ে থাকে। সারা বছর বিক্রি না হলেও জৈষ্ঠ্য মাস থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বেশি চাহিদা থাকে। কারণ ঐ সময় বাজারে আনারসের মৌসুম চলে।

আগাছা বিক্রেতা মোমিনপুর গ্রামের শামছুল আলম জানান, তিনি জৈষ্ঠ্য মাসে থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত আগাছা বিক্রি করে থাকে। প্রতিভ্যান তিনশ থেকে সাড়ে চারশ টাকা দরে বিক্রি করেন। এ কাজে তার সন্তানও সহযোগিতা ক রে। আগাছা বিক্রি করে উপার্জিত টাকায় এই কয়েক মাস চলে তার সংসার।

আনারস মৌসুমের সময় প্রতিদিন একহাজার থেকে  বারশ টাকা উপার্জন করতে পারে বলে তিনি জানান।

আব্দুর রশিদ জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে তার বাড়ির আশপাশ থেকে জগৎবেড় ও জার্মানলতা নামক আগাছা টেনে তুলে বাজারে নিয়ে তিন থেকে চারশ টাকা নগদ দামে বিক্রি করে।

ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন লিটন জানান, জগৎবেড় আগাছা দিয়ে আনারস ট্রাকে লোড দিয়ে মোকামে পাঠালে সহজে নষ্ট হয় না। সতেজ থাকে আনারস। এজন্য  গারোবাজারের  অধিকাংশ পাইকার আগাছা দিয়ে আনারস ট্রাকে লোড দিয়ে থাকে।

খড়ের চেয়ে আগাছা অনেকটা ভালো বলে তিনি জানান।

মধুপুরে এগ্রোর সত্ত্বাধিকারী ইদ্রিস কাজল বলেন, ‘দুর্মূল্যের বাজারে ফেলে দেয়া আগাছাও অভাবী মানুষের বেঁচে থাকার মাধ্যম হয়েছে ভাবতেই ভালো লাগছে।’

আনারস ক্রেতা মিঞ্জূর রহমান মিন্টু জানান, খড় দিয়ে আনারস পাঠানোর চেয়ে আগাছা দিয়ে পাঠানো অনেক ভালো। ঘাস দিয়ে আনারস পাঠালে কম ক্ষতি হয়, আনারস ভালো থাকে। ভালো দামে বিক্রি করা যায়। দেখতে ভালো থাকে। আর এ জন্যই ফল সাজাতে খরের চেয়ে আগাছাই ভালো এবং এটা সহজ লভ্যও।

কুলি শ্রমিকরা জানান, খড়ের চেয়ে আগাছা দিয়ে আনারস ভরা অনেক আরাম ও আয়েশ। আগাছায় কোনো ময়লা থাকে না। সবুজ আগাছায় আনারস সতেজ থাকে। মোকামে পৌঁছানোর পরেও রঙ কোনো রকম ঘোলাটে হয় না।