সূতি নয়া পাড়ার ইয়াসমিন বেগম দুই সন্তানের মা। আর্থিক আর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে নতুন করে সন্তান নিতে চান না । লাইগেশনের মতো স্থায়ী পদ্ধতি নিয়েও ভয়। এ জন্য জন্মনিরোধক সামগ্রীর ওপর ভরসা। গোপালপুর উপজেলা সদর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র থেকে দীর্ঘ দিন ধরে তিনি অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনা মূল্যে সংগ্রহ করেন । দুই সন্তান অসুস্থ হলে ঘরের কাছের কেন্দ্ৰ থেকেই বিনা মূল্যে ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ নেন। কিন্তু ছয় মাস ধরে এখানে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী তো দূরের কথা সাধারণ রোগের ওষুধও মিলছে না। বিত্তহীন পরিবারের সদস্যরা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ চিত্র শুধু গোপালপুরে নয়, সারা দেশ জুড়েই জন্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় হতশ্রীদশা বিরাজ করছে।
জানা যায়, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে ছয় মাস ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী এবং সাধারণ রোগের ওষুধ নেই। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অধিদপ্তর সুত্রে বলা হয়, জনগনের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সে পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় চালু করে। ক্লিনিক ও নন ক্লিনিক পর্যায়ে এখানে একজন মেডিক্যাল অফিসার, একজন পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, একাধিক ফার্মাসিস্টসহ ১১৩ জন স্টাফ রয়েছেন। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্ৰে একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার এবং একাধিক পরিদর্শক রয়েছেন।
নব্বইয়ের দশকে তৈরি হয় সুদৃশ্য ভবন । ইউনিয়ন পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা বিনা মূল্যে এমআর, গর্ভবতী মায়েদের চেকআপ, স্বাভাবিক প্রসব, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের চিকিৎসা, ওষুধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষা দেওয়া হয়। দীর্ঘ দিন ধরে শেকড় পর্যায়ের মানুষ ঘরের কাছের কেন্দ্র থেকে বিনা মূল্যে সেবা পেয়েছেন। কিন্তু টানা ছয় মাস ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী এবং সাধারণ ওষুধ সরবরাহ না থাকায় মৌলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর, মধুপুর, ধনবাড়ী, ঘাটাইল উপজেলার কয়েকজন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার জানান, প্রতিদিন বহু গরিব রোগী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীসহ সাধারণ রোগের ওষুধ নিতে ভিড় জমান। কিন্তু স্টোর শূন্য থাকায় খালি হাতে ফিরে যান। গোপালপুর উপজেলার পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা কামরুন্নাহার জানান, মাঠকর্মীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে দম্পতিদের মধ্যে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ এবং স্বাস্থ্য ও জন্মনিরোধ বিষয়ে সচেতন করতেন। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এখনো সচেতন নন। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দরিদ্র দম্পতিরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বাইরের দোকানে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দাম অনেক বেশি। দিনমজুর শ্রেণী—যারা দিন আনে দিন খান, তারা উচ্চমূল্যে এসব কিনতে চান না। ফলে বিত্তহীন পরিবারগুলো অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়ছেন।
গোপালপুর উপজেলা মেডিক্যাল অফিসার (মা, স্বাস্থ্য ও শিশু) ডা. শারমীন আখতার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “স্টোরে এখন কোনো অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বা ওষুধ নেই। বিষয়টি খুবই দুশ্চিন্তার। এখন শুধু স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি চালু রয়েছে।’
টাঙ্গাইল জেলা পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক আব্দুল লতিফ মোল্লা জানান, টাঙ্গাইলের ১২ উপজেলায় ৮১টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। দুই বছর যাবৎ অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী এবং ওষুধ নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে না। কেন এমনটি হচ্ছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন।’ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সমস্যাটি অনেক পুরোনো। এটি সমাধানের চেষ্টা চলছে ।