মির্জাপুরে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আমছের আলী নিয়মিত ভাতাসহ মুক্তিযোদ্ধার সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন,সন্তানদের দিয়েছেন সরকারী চাকুরি!

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের মৃত ইন্তাজ আলীর ছোট ছেলে আমছের আলী। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তার কোনো সার্টিফিকেট না থাকলেও ভাতাপ্রাপ্তির সব কাগজপত্র সংগ্রহ করে নিয়মিত ভাতাসহ মুক্তিযোদ্ধার সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধার সুবিধা নিয়ে আমছের আলীর দুই ছেলে এক মেয়ের চাকরিও হয়েছে। এ নিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় লোকজনের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

আমছের আলীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে তার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বাতিলসহ সন্তানদের চাকরি থেকে অব্যাহতির দাবি জানিয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন উপজেলার টাকিয়া কদমা গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে মো. ফিরোজুল ইসলাম দুলাল।

এ ছাড়া ওই মুক্তিযোদ্ধা লতিফপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন ফিরোজুল ইসলাম দুলাল।

আমছের আলীর তিন সন্তান ইয়াকুব আলী ছিট মামুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হালিমা বেগম ও ইউনুস আলী মিয়া কদমা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত ইন্তাজ আলীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে আমছের আলী সবার ছোট। তিন নম্বর ভাই তোফাজ্জল হোসেন। তার জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে জানা যায়, ১৯৫৭ সালের ১ মে তোফাজ্জল হোসেনের জন্ম। আর আমছের আলীর জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর।

৫ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট হয়েও আমছের আলী জাতীয় পরিচয়পত্রে বড় ভাইকে ছোট সাজিয়ে দেড় বছর বয়স বাড়িয়েছেন। এরপর বিভিন্ন পন্থায় কয়েকজন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং সাবেক দুই সংসদ সদস্যের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন নিয়েছেন। নাম লিখিয়েছেন লাল মুক্তিবার্তায়। তার বেসামরিক গেজেট নম্বর ৬৫৯৭।

অভিযোগপত্রে দুলাল উল্লেখ করেন, প্রয়াত এমপি একাব্বর হোসেনের সখ্যতায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আমছের আলী তিন ছেলে-মেয়েকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের চাকরি দিয়েছেন।

গ্রামের সবাই এ ব্যাপারে জানে। কিন্তু অভিযোগের জায়গা পাচ্ছে না। তদন্তে এলে গ্রামের ৯৫ ভাগ মানুষ সত্য কথা বলবে। টাকার বিনিময়ে অসৎ পথ অবলম্বন করে বড় ভাইদের চেয়ে বয়স বাড়িয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমছের আলী কিভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হলেন তা আমার জানা নেই। তার বড় ভাই তোফাজ্জল হোসেন আমার বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমছের অনেক ছোট ছিল। তখন তার বয়স ৭-৮ বছর হবে।’

৭০ বছরের আব্দুল আলীম বলেন, ‘তার বড় ভাই তোফাজ্জল সমবয়সী। আমছের অনেক ছোট। মুক্তিযুদ্ধ করে নাই। তখন তার বয়স ৭-৮ বছর হবে।’

আমছের আলীর বড় ভাই তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

আমছের আলী ছোট ছেলে কদমা দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ইউনুস আলী জানান, তার চাকরি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় হয়েছে। বড় চাচা তোফাজ্জল হোসেন লেখাপড়ার জন্য বয়স কমিয়েছিলেন। তার বাবার পরিচয়পত্রের বয়স সঠিক এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।

মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সদস্যসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বলেন, আমছের আলী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নয় বলে এলাকাবাসী তাকে জানিয়েছে।

আমছের আলীর বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার কমান্ডারের নাম কী—জানতে চাইলে জোয়াহের নামের এক মুক্তিযোদ্ধার নাম বলেন। তার পরিচয় জানতে চাইলে বলেন, মারা গেছেন।

যুদ্ধকালীন সময়ে কী কী অস্ত্র চালিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, থ্রি নট থ্রি। সহযোদ্ধাদের নাম এবং কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন তার উত্তরে বলেন, ‘আমি তো আপনাদেরই। সব পরে বলব, থামেন।’ তার কাছে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কোনো সার্টিফিকেট নেই বলে তিনি জানান। আমছের আলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান।

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া ইয়াসমিন বলেন, ‘এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’