সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টাঙ্গাইলের নাগরপুরে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য। কর্মরত প্রধান শিক্ষক ও সিনিয়র শিক্ষকদের নামে একটি কোচিং কার্যক্রমের প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, উপজেলার দুয়াজানী এলাকায় ‘নাইট কেয়ার একাডেমি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের লিফলেট বিতরণের কোচিং কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি চলছে। রফিক রাজু ক্যাডেট স্কুল ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে ওই কোচিং সেন্টারের প্রচারণা চালানো হয়েছে। পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তির ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। প্রচারপত্রে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পাঠদানের সময়সূচিও উল্লেখ রয়েছে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাঝেও নাইট কেয়ার একাডেমির লিফলেট বিতরণের দৃশ্য দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রচারিত লিফলেট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন ঘুণিপাড়া আব্দুর রশিদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও গয়হাটা উদয়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল আউয়াল মিলন। এছাড়া পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বনগ্রাম শহীদ মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফজলুর রহমান। সহকারী পরিচালক হিসেবে রয়েছেন বেকড়া বিশ্বেশ্বর মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান এবং ঘুণিপাড়া আব্দুর রশিদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক বাবু রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’-এর ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষক বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের মালিকানা, পরিচালনা বা লাভজনক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকতে পারবেন না। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নাম সরাসরি পরিচালনা পর্ষদে উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, সাবেক শিক্ষক হিসেবে আব্দুল আউয়াল মিলনের সম্পৃক্ততা সরাসরি নীতিমালার আওতায় না পড়লেও, বর্তমান কর্মরত ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সম্পৃক্ততাই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়রা বলেছেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা যদি সরাসরি কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী করার প্রবণতাও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নাইট কেয়ার একাডেমির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল মিলনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মো. ফজলুর রহমান মুঠোফোনে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসির সঙ্গে মৌখিকভাবে আলোচনা করেছি। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সহায়ক উদ্যোগ হিসেবে কার্যক্রমটি চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সমস্যা বা আপত্তি থাকলে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই কার্যক্রম থেকে সরে আসব।’
বেকড়া বিশ্বেশ্বর মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। যদি আমার নাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি তাদের এ বিষয়ে না করে দেবো।’
শিক্ষক ও কোচিংয়ের সহকারী পরিচালক বাবু রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, ‘স্কুল টাইমের বাইরে আমরা কিছুটা সময় দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি, এইটুকুই। তবে আমি সরাসরি ওইভাবে এর সঙ্গে যুক্ত নই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের পরিচালকের সঙ্গে কথা বললেই ভালো হবে।’
রফিক রাজু ক্যাডেট স্কুলের পরিচালক মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘স্থানটি পরিচিত করার জন্য আমাদের রফিক রাজু ক্যাডেট স্কুলের নাম ব্যবহার করে প্রচার করা হচ্ছে। তারা আমাকে পার্টনার হিসেবে যুক্ত করতে চেয়েছিল, তবে আমি তাদের তা করতে নিষেধ করেছি। বর্তমানে তারা জায়গাটি মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করছে। এরপরও যদি লিফলেটে আমার নাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি এখনই ফোন করে তা বন্ধ করতে বলবো এবং আমার নাম ব্যবহার না করার জন্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবো।’
বিষয়টি নিয়ে নাগরপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাদির আহমেদ বলেন, ‘যদি কোনো শিক্ষক আমাদের নির্ধারিত কার্যক্রমের বাইরে থেকে অনুপস্থিত থাকেন বা কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখব।’
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. এরফান উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখনো অবগত নই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’